Thursday, May 14, 2020

কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি সিনেমাওয়ালা

সুশান্ত ঘোষ


কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি বরাবরই নতুন কিছু ভাবায়। পথ দেখায় নবনির্মাণের। কখনোবা এমন কিছু পথে নিয়ে গিয়ে দর্শকদের ছেড়ে দেয় যে পথ হয়তো আমাদের বাড়ির খুব কাছের পায়ে চলা একটি পথ, যা বহুদিনের অব্যবহারে ঢেকে গিয়েছে ঘাসের জঙ্গলে। হয়তো সেই পথে চলতে গিয়ে মনোবিকারের খোলস চিরে বেরিয়ে পড়ে মানুষের ভেতরের মুখটা, কখনোবা ঐতিহ্য ও আবেগের জং-ধরা পাটাতনে শিরীষ কাগজ ঘষে ঘষে পরিচালক দেখাতে চান ভেতরের লোহাটুকু এখনও চকচক করছে কিনা!

    এই ছবিতে দেখানো হয়েছে সিনেমাহলের ইতিহাসে যুগপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি প্রজন্ম এবং সেই প্রজন্মের দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষের পারস্পরিক সংঘাত ও অস্তিত্বরক্ষার লড়াই এর কথা। সিনেমা হলগুলি সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে ধীরে ধীরে ডিজিটালাইজেশন এর যুগে পরিবর্তিত হতে হতে আজ হাতের মুঠোয় ছ-ইঞ্চি স্ক্রিনে বন্দি হয়ে গেছে। এর ফলে বহু পুরোনো সিনেমাহল একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। তেমনই এক সিঙ্গেল স্ক্রিনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা কমলিনী টকিজের মালিক প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) এখনো আঁকড়ে রয়েছেন সেই হলটিকে। সাথে আছে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী হরি (অরুণ গুহঠাকুরতা)। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় মন কেড়ে নেয়। কোত্থাও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। একজন অভিনেতার অভিনয় যখন অভিনয়ের সীমা ছাড়িয়ে নেমে আসে বাস্তবের আঙিনায়, তখন সেই গল্পের চরিত্র ও বাস্তবের মানুষটা এক হয়ে যান। কোনো বিভেদ থাকেনা দুজনের মধ্যে।

    প্রণবেন্দুর বাবার পৈতৃক ব্যবসা মাছের আড়ত। সেই মাছব্যবসায়ী প্রণবেন্দু সিনেমাকে ভালোবেসে স্ত্রীর নামে গড়েছিলেন কমলিনী টকিজ। এটি তার ভালোবাসার জায়গা সাধনার ক্ষেত্র। সময়ের দাবি মেনে পুরোনো যন্ত্রপাতি বিক্রি করে হলটিকে নতুন করে তৈরির পরামর্শ দিয়েছিল তার ছেলে প্রকাশ। মানতে চায়নি প্রণবেন্দু। ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় কমলিনী টিকিজ, তবু রোজ হরি ও প্রণবেন্দু গভীর রাত পর্যন্ত কমলিনী টকিজেই সময় কাটায়। গল্প করে উত্তমকুমারের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে। প্রণবেন্দু স্বপ্ন দেখে একদিন সত্যিকারের হিরো আসবে। যে শুধু সিনেমা জগতে নয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে অবক্ষয়িত সমাজকে সঠিক নেতৃত্ব দেবে। শেখাবে মূল্যবোধের পাঠ।

    প্রণবেন্দুর ছেলে প্রকাশের ভূমিকায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় মানানসই। সে বাংলা ও হিন্দি সিনেমার চুরি করে বানানো ডিভিডি ভাড়া দেয় ও বিক্রি করে। বাবার সাথে তার এই নিয়েই বিরোধ। প্রণবেন্দু কমলিনী টকিজের অবলুপ্তির জন্য ছেলেকেই দায়ী করেন। সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে রাজনীতি। রমরমিয়ে চুরির ডিভিডি বেচা-কেনা চলছে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের সামনেই। চুরি করে তৈরি করা এই ডিভিডি বেচেই প্রকাশ স্ত্রীর স্বপ্ন ও ছোটো বড়ো আবদার পূরণ করে।

    প্রকাশের স্ত্রীর ভূমিকায় সোহিনী সরকার দর্শকের সমস্ত মমতা কেড়ে নিয়েছে। খুব অল্পে খুশি হওয়া এক সরল মেয়ে। সে চেষ্টা করেছে বাবা ছেলের মধ্যে একটা সেতুপথ তৈরি করার। শ্বশুর-বউমা সম্পর্ক ছাড়িয়ে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোহিনী সরকারের অভিনয় দৃশ্যের মধ্যে দর্শক বারবার বাবা ও মেয়েকে খুঁজে পাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই প্রজন্মকে সে কিছুতেই আর মেলাতে পারেনি। 

    গ্রামের পৌষ সংক্রান্তির মেলায় প্রকাশ নতুন ডিজিটাল প্রজেক্টর কিনে পর্দা খাটিয়ে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করে। মাটিতে পাঁচ টাকা। চেয়ারে কুড়ি টাকা। দর্শকের লাইন লেগে যায় সেই সিনেমা দেখার জন্য। হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়। সব আলো নিভে যায়। কমলিনী টকিজের জানলায় দাঁড়িয়ে প্রণবেন্দু হরিকে বলে, এবার কি হবে! কীভাবে দেখাবে ওরা চুরির সিনেমা! হরি বোঝায়, এত বড়ো মেলা হচ্ছে নিশ্চই সেখানে জেনারেটর এর ব্যবস্থা থাকবে! ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই দূর থেকে শোনা যায় জেনারেটরের আওয়াজ। থমথমে অন্ধকার গ্রামটা যেন সশব্দে জেগে ওঠে। হরি দেশলাই জ্বলতে গেলে প্রণবেন্দু নিষেধ করে বলে, কিছুক্ষণ থাক এমনটা! সেই অন্ধকার চিরে চিরে হরি শুনতে পায় তার কত্তার আরো কয়েকটি শব্দ। প্রণবেন্দু সিদ্ধান্ত নেন প্রজেক্টরটা বেচে দেবার। তারপর রাত্তিরের অন্ধকারে মেলার মাঠ ফাঁকা হয়ে গেলে হরির সাথে ছেলের সেই অস্থায়ী সিনেমা হল দেখতে যান। প্রণবেন্দু ভাবেন, তার রক্ত তার ছেলের শরীরে। সেও সিনেমাওয়ালা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সে হয়েছে চোর সিনেমাওয়ালা।

    শেষ দৃশ্যে দর্শকের সব মনোযোগ ও আকর্ষণ কেড়ে নেয় হরি চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, অরুণ গুহঠাকুরতা। হরির চরিত্রের মধ্যেমেই কৌশিক গাঙ্গুলি সিনেমার চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স টেনেছেন। ভোরবেলা লরি এসে দাঁড়ায় কমলিনী টকিজের সামনে। হরি সেই মেশিনগুলো মুছে মুছে ঝকঝকে করে দেয়। গ্রামের পথ দিয়ে সেই লরি চলে যায় ধীরে ধীরে। ২৩ বছর বয়েসের যে যুবক কমলিনী টকিজে এসে বৃদ্ধ বয়েস অবধি নিজের সমস্ত আবেগ ও ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছে সেই হরি সিঙ্গেল স্ক্রিন প্রজেক্টর বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কমলিনী টকিজের ঘরেই আত্মহত্যা করে। কৌশিক গাঙ্গুলি হরির শবযাত্রার দৃশ্য নিপুণ শিল্পীর মতো পর্দায় এঁকেছেন। একদিকে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হরির শবযাত্রা চলেছে "বলো হরি হারিবোল" বলতে বলতে, ঠিক পাশ দিয়েই উল্টো দিকে মাইকে হাঁকতে হাঁকতে চলেছে মেলার মাঠে নতুন ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেখানো প্রকাশের অস্থায়ী সিনেমা হলের টিকিট বিক্রির বিজ্ঞাপনের গাড়ি― "আসুন আসুন, আজ মেলার মাঠে। নতুন ঝকঝকে পর্দায় নতুন বাংলা-হিন্দি ছবি দেখুন। টিকিট : মাটিতে পাঁচ টাকা, চেয়ারে : কুড়ি টাকা।"

   এরপর... শেষ ক্লাইম্যাক্সের পর্দা টানলেন পরিচালক। হরির সাথে যাত্রা করার আগে কমলিনী টকিজের সমস্ত কাগজপত্র, রিল, ক্যাসেট লন্ডভন্ড করে মাটিতে ফেলে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল প্রণবেন্দু। দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো কমলিনী টকিজ, জ্বলতে লাগলো প্রণবেন্দুর সারাজীবনের জড়ো করা সমস্ত বিশ্বাস, ভালোবাসা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা। জ্বলতে লাগলো সময়ের তালে তলিয়ে না যাওয়া, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে আঁকড়ে থাকা এক সিনেমাওয়ালা...

Paran Bandyopadhyay Koushik Ganguly Parambrata Chattopadhyay Sohini Sarkar

Saturday, May 2, 2020

বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ও তৎকালীন বাংলা

সুশান্ত ঘোষ

ছবি সৌজন্যে : এই সময় ডিজিটাল

সময়টা ১৯০৫, ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবে সমগ্র বাংলা তখন উত্তাল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন, চরমপন্থী নেতা ও বিপ্লবী গুপ্ত সমিতির পাশাপাশি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল বাংলার ছাত্রসমাজের মধ্যে। দিকে দিকে চালু হল পিকেটিং করা ছাত্রদের দমন-পীড়ন করার নীতি। বাংলার ছাত্রদের যে কোনো প্রকারে স্বদেশী আন্দোলন থেকে বিরত করার লক্ষ্যে মুখ্যসচিব আর.ডব্লিউ কার্লাইল এর নেতৃত্বে ১৯০৫ এর অক্টোবর মাসের পর চালু হলো কুখ্যাত কার্লাইল সার্কুলার। এই সার্কুলারে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বদেশী গান গাওয়া ও "বন্দেমাতরম্" ধ্বনি দেওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হলো এবং স্বদেশী আন্দোলনের সাথে যুক্ত সমস্ত ছাত্রদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিতারণের নির্দেশ দিল ব্রিটিশ সরকার। এমন এক নৃশংস প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কলকাতা ও ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের মধ্যে দেখা দিল আরও দ্বিগুণ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল। 

    শহরের সেই ছাত্র আন্দোলন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো মফস্বলে, সেখান থেকে গ্রাম-গঞ্জের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রতিবাদের আঁচ এসে লাগলো রংপুর জেলা স্কুলে। সেখানকার ছাত্ররা "বন্দেমাতরম্" ধ্বনি দিয়ে পিকেটিং করে প্রতিবাদে সামিল হলো। অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার বগুড়ার একটি ছোট্ট গ্রাম বিহার। সেখান থেকে একটি ছেলে পড়তে আসতো রংপুর জেলা স্কুলে। নবম শ্রেণির সেই ছাত্রটির মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়ছিল দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ। সেও সামিল হলো এই প্রতিবাদে। কয়েকদিনের মধ্যেই অন্যান্য প্রতিবাদী ছাত্রদের সাথে তাকেও বহিষ্কার করা হলো স্কুল থেকে। সেই দিন থেকেই নবম শ্রেণীর প্রফুল্লর হাতেখড়ি হলো বিপ্লবে। নবজন্ম হলো বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর। 

    এই ঘটনার পর আর ধরে রাখা যায়নি প্রফুল্লকে। সে ক্রমশ এগিয়েছে। ইতিহাস যাকে বরণ করবে বলে বরমাল্য নিয়ে বসে আছে, কে আর তাকে আটকায়! রংপুরের কৈলাস রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে সেই বৈপ্লবিক সাধনার প্রসার ঘটে বিপ্লবী অবিনাশ চক্রবর্তী, জিতেন্দ্রোনারায়ণ রায় সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে। 

    এদিকে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ আইন পাশ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসাবে জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলারকে নিযুক্ত করেন। ঠিক সেই দিনই ১৯০৫ এর ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে সারা বাংলা জুড়ে অরন্ধন দিবস ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশে পালিত হয় রাখিবন্ধন উৎসব। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মেদিনীপুরে। সাধারণ মানুষ খালি গায়ে খালি পায়ে হেঁটে কংসাবতী নদীতে এসে স্নান করে শপথ নেয় বিদেশি দ্রব্য বর্জন করার। শুরু হয় স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদন।

    ১৯০৬ সালে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ভাই বারিন ঘোষের হাত ধরে আঠারো বছরের প্রফুল্ল আসে কলকাতায়। অনুশলীলন সমিতির সাথে তখন মতভেদের কারণে অরবিন্দ ঘোষ, বারিন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত প্রমুখ বিপ্লবীরা গঠন করেছেন "যুগান্তর দল"। স্বামী বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যুগান্তর দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র "যুগান্তর" পত্রিকা। বারিন ও অরবিন্দ ঘোষকে রাজনৈতিক গুরু মেনে প্রফুল্ল যোগ দেয় যুগান্তর দলে।

    আসাম ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশের নবনিযুক্ত লেফটেন্যান্ট গভর্ণর জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার ক্রমশ হিন্দু-মুসলমান বিভেদ সৃষ্টি করে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনকে বানচাল করতে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের ক্ষেপিয়ে তুলছিলেন। যুগান্তর দলের সদস্যরা স্বদেশী আন্দোলনে বাংলার হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে ফুলারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ভার দেওয়া হয় প্রফুল্লর ওপর। বারিন, উল্লাসকর সহ নেতারা ঠিক করেন জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করে তার টাকায় অস্ত্র কিনে ফুলারকে হত্যা করা হবে। কিন্তু জমিদার বাড়িতে ডাকাতির এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। তারপর একবার রেল স্টেশনে বোমা রেখে ফুলারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। বোমা রেখেছিলেন প্রফুল্ল। কিন্তু ফুলার সেই যাত্রা স্থগিত করায় এই প্রচেষ্টাও পরবর্তীকালে আর সফল হয় নি।

    কলকাতার ৯৩/এ বাবুবাজার স্ট্রিটে ছিল যুগান্তর দলের প্রধান কার্যালয়। এই দলের অন্যতম সদস্য হেমচন্দ্র কানুনগো বিদেশ থেকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ শিখে এসে মানিকতলায় ১৯০৭ সালে গোপনে একটি বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন করে কর্মীদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। আর প্রকাশ্যে চলে ধর্মীয় স্কুল। এইখানেই প্রফুল্ল সহ দলের অন্যান্য সদস্যদের বোমা ছোঁড়ায় হাতেখড়ি। 

    বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের পিছনে লর্ড কার্জনের ভূমিকা প্রধান হলেও অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব আরো একজন ব্যক্তির মস্তিষ্ক প্রসূত। তিনি বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্ণর (১৯০৩-০৮) স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার। কার্জন বঙ্গভঙ্গ বিষয়ের যে কোনো প্রস্তাব গ্রহণের পূর্বে ফ্রেজার সাহেবের সাথে আলোচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতেন। সরকারি দলিলও সেই ইঙ্গিতকে নির্দেশ করে। 

    ফুলারের মতো ফ্রেজারও ছিলেন একজন অত্যাচারী শাসক। ১৯০৭ সালে যুগান্তর দলের সদস্যরা এই ফ্রেজার সাহেবকেও হত্যার পরিকল্পনা করেন। প্রধান দায়িত্ব পড়ে প্রফুল্ল চাকীর ওপর। সঙ্গে ছিলেন যুগান্তর দলের নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, উল্লাসকর দত্তের মতো বিপ্লবীরা। দুবার রেল লাইনের নীচে বোমা রেখে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হলে দুবারই প্রফুল্লরা ব্যর্থ হন।

    ওদিকে ভগিনী নিবেদিতা নিজে মেদিনীপুরে এসে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন একটি ব্যায়ামাগার এর। সেই ঘটনার অনুপ্রেরণায় সারা মেদিনীপুর অঞ্চলে একের পর এক ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কারণ তখন দেশীয় নেতারা বুঝেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের সাথে লড়তে গেলে শরীর ও স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। মেদিনীপুরে সত্যেন বসুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যয়ামাগারে শরীর চর্চার পাশাপাশি চলতে থাকে গোপনে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড। এখানেই রাজনৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিত হতে থাকে বাংলার আর এক অগ্নিপুত্র ক্ষুদিরাম বসু। 

    অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কাছে "বন্দেমাতরম্" ছিল এক অগ্নিমন্ত্র। এই মন্ত্রেই হাজার হাজার যুবক দীক্ষিত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে। ভারতমাতার শৃঙ্খল মোচনে তারা ঝাঁপ দিয়েছে বিপ্লবের আগুনে। বন্দেমাতরম্ শুনলেই রাজ কর্মচারীরা ক্ষেপে যেত। তাই প্রকাশ্য স্থানে বন্দেমাতরম্ উচ্চারণ ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ। আলিপুর আদালত প্রাঙ্গণে এই বন্দেমাতরম্ ধ্বনি দেবার মতো দুঃসাহসিক কাজ করেছিল ১৫ বছরের একটি ছেলে সুশীল সেন। কুখ্যাত অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ট সুশীল সেনকে এই অপরাধে ১৫ ঘা বেত মারার আদেশ দেন।

    এই ঘটনায় দেশীয় সংবাদপত্রের পাতায় তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমনিতেই অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ট এর বিচারে একের পর এক বিপ্লবীদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হচ্ছিল। সুশীল সেনের এই ঘটনায় আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে। যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা ঠিক করে, আর নয়, এবার ওই অত্যাচারী কিংসফোর্টকে উচিত শিক্ষা দিতেই হবে। কিংসফোর্টের হত্যার ভার পরে প্রফুল্লর উপর সঙ্গে থাকবে সেই বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত যুবক সুশীল সেন। কারণ তখন এই বিষয়ে প্রফুল্লই দলের সবচেয়ে উপযোগী। পরে ঠিক হয়  ক্ষুদিরাম বসুকে প্রফুল্লর সহযোগী হিসেবে পাঠানো হবে।

    এরপর আসে সেই দিন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যা। অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। ইতিহাসের পাতায় যেন লেখা হবে একের পর এক ট্রাজেডি। তারই প্রস্তুতি চলছে যেন অলক্ষ্যে। বিহারের মজফরপুরের ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে অপেক্ষা করে আছে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া দুই যুবক। ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনের গ্যাসবাতির ক্ষীণ আলো এসে পড়েছে অন্ধকার ঝোপের ফাঁকে। সেই টুকরো আলোয় একজোড়া চোখে ঝকমক করছে স্বাধীনতার আলো। বুকের মধ্যে টলমল করছে আবেগ। না কিছুতেই ব্যর্থ হবেনা তারা। প্রফুল্ল এবার সফল হবেই। এর আগের দুবার সে ব্যর্থ হয়েছে। কিছুতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হবেনা এবার। হঠাতই যেন তার চোখে একঝলক ভেসে ওঠে বগুড়ার ছবি। ছোট্ট ঘরে কেমন আছে তার মা? প্রদীপ জ্বালিয়ে কি অপেক্ষা করছে প্রফুল্ল ঘরে ফেরার! হঠাতই তার চোখে ঘনিয়ে আসে আরো গভীর অন্ধকার। প্রফুল্ল দেখতে পায় গভীর আঁধারে বসে তার দেশমা কাঁদছে। অবহেলিত লাঞ্ছিত দেশ মায়ের মুখের দিকে প্রফুল্ল আর তাকাতে পারছেনা। মুহূর্তে রক্ত গরম হয়ে ওঠে তার, এবার আর কিছুতেই হেরবেনা সে। মশার কামড়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে সর্বাঙ্গ তবু সেদিকে হুশ নেই ওদের। পাখির চোখের মতো তাকিয়ে আছে ইউরোপিয়ান ক্লাবের দিকে।

    একটা ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যায়। এই তো সেই  অত্যাচারী কিংসফোর্ট এর গাড়ি। যার বিচার কেড়ে নিয়েছে বাংলার অনেক যুবকের প্রাণ, খালি করেছে বাংলা মায়ের কোল। এবার ঠিক লক্ষ্যে বোমাটা ছুড়তে হবে। তৎপর হয়ে ওঠে ক্ষুদিরাম। প্রফুল্ল সাবধান করে তাড়াহুড়ো নয় ক্ষুদি। আর একটু আসতে দে। নতুন নামদুটো মনে রাখিস। খবরদার। মরবি তবু ধরা দিবি না। গাড়িটি কাছাকাছি আসতেই বোমা নিক্ষেপ করে ওরা। সজোরে উল্লাসে বলে ওঠে "বন্দেমাতরম্"। গর্জে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন, কেঁপে ওঠে দেশমায়ের বুক। কিংসফোর্টের বদলে নিহত হন এক ব্রিটিশ মহিলা সহ কোচোয়ান, অন্য একজন মহিলা গুরুতর আহত। পরে তারও মৃত্যু ঘটে

    সেই যুবক দুটো তখনও জানেনা গাড়িতে কারা ছিল। দুজন দুই পথে পালিয়ে যেতে থাকে। দেশ মায়ের কান্না মোছাতে আজ তারা নিজের দেশেই অপরাধী। ক্ষুদিরাম ধরলেন সমস্তিপুরের পথ আর প্রফুল্ল ধরলেন অন্য পথ। সরকার সিল করে দিল শহরের সমস্ত স্টেশন। যাতে একটা মাছিও না গলতে পারে। সারারাত চললো চিরুনি তল্লাশী। সকাল আটটা নাগাদ মুড়ি জল খেতে গিয়ে ক্ষুদিরাম ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। 

    প্রফুল্ল হাঁটতে হাঁটতে একসময় ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লো। একজন সহৃদয় ব্যক্তি তাকে খাবার খাওয়ালেন। নতুন জামাকাপড় দিয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে দিলেন। প্রফুল্ল জানেনা ক্ষুদি কোথায়! সে কি পালাতে পেরেছে! যাক অন্ততপক্ষে এবার সে অসফল হয়নি। এবার কলকাতায় গিয়ে আগে দেখা করবে বারিনদার সাথে। এখন দলের মধ্যে থাকা ঠিক নয়, দলের অন্য সদস্যরা বিপদে পড়তে পারে। কিন্তু বারিনদাকে বলতে হবে ক্ষুদির খোঁজ করতে। সেও নিশ্চই অন্য পথে কলকাতায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। তেমনটাই কথা হয়েছে। এবার একদিন বগুড়া যেতে হবে। কেন জানিনা বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে তার। কেমন আছে সবাই কে জানে! স্টেশনে এসে অপেক্ষা করতে থাকে ট্রেনের। একজন ব্যক্তি গায়ে পড়ে এসে আলাপ জুড়লেন। সন্দেহ হলো প্রফুল্লর। পুলিশের লোক নয়তো! তাকে কোনো রকমে কাটিয়ে ট্রেনে চাপলো প্রফুল্ল।

    কি জ্বালা ট্রেনেও যে লোকটা পিছু নিয়েছে। এ নিশ্চই পুলিশের লোক! ট্রেনের লোকজনের কথা বার্তায় প্রফুল্ল বুঝতে পারে লোকটি সিংভূমের এস.আই নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সাথে আরো তিন কনস্টেবল। প্রচন্ড রাগ হয় প্রফুল্লর লোকটার ওপর। একজন বাঙালি হয়ে সে একজন বাঙালিকেই ধরিয়ে দেবে ওই বিদেশিদের হাতে! দেশের প্রধান শত্রু তো এরাই।

    মোকামাঘাট স্টেশনে এসে কলকাতার টিকিট কাটে প্রফুল্ল। নন্দলাল তিন কনস্টেবল নিয়ে তাড়া করে প্রফুল্লকে। প্রফুল্ল দৌড়াতে দৌড়াতে হোঁচট খেয়ে পড়ে। কিছুতেই ধরা দেবেনা সে। এখনও অনেক কাজ বাকি তার। আর সে ধরা পড়লে বাকিদের বিপদ হবে। কিন্তু অতজন স্বশস্ত্র পুলিশের সঙ্গে পেরে ওঠেনা প্রফুল্ল। বুলেটের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার মাথা, ঝাঁঝরা হয়ে যায় একটি যুবকের স্বাধীন দেশ দেখার স্বপ্ন....

    সেদিন ছিল ২ মে ১৯০৮। পুলিশের গাড়ি থেকে ক্ষত-বিক্ষত লাশটাকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনা হয় মাটিতে। দুটো ফটো তুলে ঝটপট ডেথ সার্টিফিকেট এ লেখা হয় সুইসাইট কেস অর্থাৎ আত্মহত্যা। কিন্তু এইখানেই প্রশ্ন তুলেছেন কিছু কিছু ঐতিহাসিক। সেদিন কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছিল প্রফুল্ল? নাকি তরতাজা এই যুবককে সেদিন পুলিশের বুলেট ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল? প্রশ্ন তুলেছেন প্রাবন্ধিক নির্মলকুমার নাগ। "তথ্যসূত্র" নামক গবেষণাধর্মী পত্রিকার "প্রয়াণকথা স্মরণকথা" সংখ্যায় "প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যু : দেখি নাই ফিরে" প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে এবং "এই সময়" সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদনে তিনি নানারকম যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন আমরা ছোটবেলা থেকে কতটা ভুল ইতিহাস পড়ে এসেছি। 

    শেষ করবো আর কয়েকটি কথা বলে। গত ১৫ এপ্রিল একটি খবর প্রকাশিত হয়। লকডাউনে অভুক্ত রয়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ প্রফুল্ল চাকীর পরিবার। এখন তারা দক্ষিণ দিনাজপুরের বাদিন্দা। প্রফুল্ল চাকীর নাতনি মাধবী তালুকদারের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে রাজ্য সরকার।

    আজ সেই ২ মে। প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেছেন নাকি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এই তথ্য খোঁজার দায়িত্ব ঐতিহাসিকের কিন্তু একটু অবশ্যই বলতে পারি প্রফুল্লনামক দেশপ্রেমীর আত্মার-হত্যা কখনও হয় না। প্রফুল্ল, ক্ষুদিরামরা রয়ে যায় যুগে যুগে কালে কালে অত্যাচারী শাসকের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে। আমরা যেন এই দেশপ্রেমিকের থেকে আর কিছু না হোক, প্রকৃত দেশপ্রেমটুকু শিখতে পারি এতেই তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো হবে।

২ মে ২০২০ শনিবার

কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি সিনেমাওয়ালা

সুশান্ত ঘোষ কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি বরাবরই নতুন কিছু ভাবায়। পথ দেখায় নবনির্মাণের। কখনোবা এমন কিছু পথে নিয়ে গিয়ে দর্শকদের ছেড়ে দেয় যে প...