সুশান্ত ঘোষ
কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি বরাবরই নতুন কিছু ভাবায়। পথ দেখায় নবনির্মাণের। কখনোবা এমন কিছু পথে নিয়ে গিয়ে দর্শকদের ছেড়ে দেয় যে পথ হয়তো আমাদের বাড়ির খুব কাছের পায়ে চলা একটি পথ, যা বহুদিনের অব্যবহারে ঢেকে গিয়েছে ঘাসের জঙ্গলে। হয়তো সেই পথে চলতে গিয়ে মনোবিকারের খোলস চিরে বেরিয়ে পড়ে মানুষের ভেতরের মুখটা, কখনোবা ঐতিহ্য ও আবেগের জং-ধরা পাটাতনে শিরীষ কাগজ ঘষে ঘষে পরিচালক দেখাতে চান ভেতরের লোহাটুকু এখনও চকচক করছে কিনা!
এই ছবিতে দেখানো হয়েছে সিনেমাহলের ইতিহাসে যুগপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি প্রজন্ম এবং সেই প্রজন্মের দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষের পারস্পরিক সংঘাত ও অস্তিত্বরক্ষার লড়াই এর কথা। সিনেমা হলগুলি সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে ধীরে ধীরে ডিজিটালাইজেশন এর যুগে পরিবর্তিত হতে হতে আজ হাতের মুঠোয় ছ-ইঞ্চি স্ক্রিনে বন্দি হয়ে গেছে। এর ফলে বহু পুরোনো সিনেমাহল একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। তেমনই এক সিঙ্গেল স্ক্রিনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা কমলিনী টকিজের মালিক প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) এখনো আঁকড়ে রয়েছেন সেই হলটিকে। সাথে আছে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী হরি (অরুণ গুহঠাকুরতা)। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় মন কেড়ে নেয়। কোত্থাও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। একজন অভিনেতার অভিনয় যখন অভিনয়ের সীমা ছাড়িয়ে নেমে আসে বাস্তবের আঙিনায়, তখন সেই গল্পের চরিত্র ও বাস্তবের মানুষটা এক হয়ে যান। কোনো বিভেদ থাকেনা দুজনের মধ্যে।
প্রণবেন্দুর বাবার পৈতৃক ব্যবসা মাছের আড়ত। সেই মাছব্যবসায়ী প্রণবেন্দু সিনেমাকে ভালোবেসে স্ত্রীর নামে গড়েছিলেন কমলিনী টকিজ। এটি তার ভালোবাসার জায়গা সাধনার ক্ষেত্র। সময়ের দাবি মেনে পুরোনো যন্ত্রপাতি বিক্রি করে হলটিকে নতুন করে তৈরির পরামর্শ দিয়েছিল তার ছেলে প্রকাশ। মানতে চায়নি প্রণবেন্দু। ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় কমলিনী টিকিজ, তবু রোজ হরি ও প্রণবেন্দু গভীর রাত পর্যন্ত কমলিনী টকিজেই সময় কাটায়। গল্প করে উত্তমকুমারের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে। প্রণবেন্দু স্বপ্ন দেখে একদিন সত্যিকারের হিরো আসবে। যে শুধু সিনেমা জগতে নয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে অবক্ষয়িত সমাজকে সঠিক নেতৃত্ব দেবে। শেখাবে মূল্যবোধের পাঠ।
প্রণবেন্দুর ছেলে প্রকাশের ভূমিকায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় মানানসই। সে বাংলা ও হিন্দি সিনেমার চুরি করে বানানো ডিভিডি ভাড়া দেয় ও বিক্রি করে। বাবার সাথে তার এই নিয়েই বিরোধ। প্রণবেন্দু কমলিনী টকিজের অবলুপ্তির জন্য ছেলেকেই দায়ী করেন। সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে রাজনীতি। রমরমিয়ে চুরির ডিভিডি বেচা-কেনা চলছে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের সামনেই। চুরি করে তৈরি করা এই ডিভিডি বেচেই প্রকাশ স্ত্রীর স্বপ্ন ও ছোটো বড়ো আবদার পূরণ করে।
প্রকাশের স্ত্রীর ভূমিকায় সোহিনী সরকার দর্শকের সমস্ত মমতা কেড়ে নিয়েছে। খুব অল্পে খুশি হওয়া এক সরল মেয়ে। সে চেষ্টা করেছে বাবা ছেলের মধ্যে একটা সেতুপথ তৈরি করার। শ্বশুর-বউমা সম্পর্ক ছাড়িয়ে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোহিনী সরকারের অভিনয় দৃশ্যের মধ্যে দর্শক বারবার বাবা ও মেয়েকে খুঁজে পাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই প্রজন্মকে সে কিছুতেই আর মেলাতে পারেনি।
গ্রামের পৌষ সংক্রান্তির মেলায় প্রকাশ নতুন ডিজিটাল প্রজেক্টর কিনে পর্দা খাটিয়ে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করে। মাটিতে পাঁচ টাকা। চেয়ারে কুড়ি টাকা। দর্শকের লাইন লেগে যায় সেই সিনেমা দেখার জন্য। হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়। সব আলো নিভে যায়। কমলিনী টকিজের জানলায় দাঁড়িয়ে প্রণবেন্দু হরিকে বলে, এবার কি হবে! কীভাবে দেখাবে ওরা চুরির সিনেমা! হরি বোঝায়, এত বড়ো মেলা হচ্ছে নিশ্চই সেখানে জেনারেটর এর ব্যবস্থা থাকবে! ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই দূর থেকে শোনা যায় জেনারেটরের আওয়াজ। থমথমে অন্ধকার গ্রামটা যেন সশব্দে জেগে ওঠে। হরি দেশলাই জ্বলতে গেলে প্রণবেন্দু নিষেধ করে বলে, কিছুক্ষণ থাক এমনটা! সেই অন্ধকার চিরে চিরে হরি শুনতে পায় তার কত্তার আরো কয়েকটি শব্দ। প্রণবেন্দু সিদ্ধান্ত নেন প্রজেক্টরটা বেচে দেবার। তারপর রাত্তিরের অন্ধকারে মেলার মাঠ ফাঁকা হয়ে গেলে হরির সাথে ছেলের সেই অস্থায়ী সিনেমা হল দেখতে যান। প্রণবেন্দু ভাবেন, তার রক্ত তার ছেলের শরীরে। সেও সিনেমাওয়ালা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সে হয়েছে চোর সিনেমাওয়ালা।
শেষ দৃশ্যে দর্শকের সব মনোযোগ ও আকর্ষণ কেড়ে নেয় হরি চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, অরুণ গুহঠাকুরতা। হরির চরিত্রের মধ্যেমেই কৌশিক গাঙ্গুলি সিনেমার চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স টেনেছেন। ভোরবেলা লরি এসে দাঁড়ায় কমলিনী টকিজের সামনে। হরি সেই মেশিনগুলো মুছে মুছে ঝকঝকে করে দেয়। গ্রামের পথ দিয়ে সেই লরি চলে যায় ধীরে ধীরে। ২৩ বছর বয়েসের যে যুবক কমলিনী টকিজে এসে বৃদ্ধ বয়েস অবধি নিজের সমস্ত আবেগ ও ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছে সেই হরি সিঙ্গেল স্ক্রিন প্রজেক্টর বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কমলিনী টকিজের ঘরেই আত্মহত্যা করে। কৌশিক গাঙ্গুলি হরির শবযাত্রার দৃশ্য নিপুণ শিল্পীর মতো পর্দায় এঁকেছেন। একদিকে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হরির শবযাত্রা চলেছে "বলো হরি হারিবোল" বলতে বলতে, ঠিক পাশ দিয়েই উল্টো দিকে মাইকে হাঁকতে হাঁকতে চলেছে মেলার মাঠে নতুন ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেখানো প্রকাশের অস্থায়ী সিনেমা হলের টিকিট বিক্রির বিজ্ঞাপনের গাড়ি― "আসুন আসুন, আজ মেলার মাঠে। নতুন ঝকঝকে পর্দায় নতুন বাংলা-হিন্দি ছবি দেখুন। টিকিট : মাটিতে পাঁচ টাকা, চেয়ারে : কুড়ি টাকা।"
এরপর... শেষ ক্লাইম্যাক্সের পর্দা টানলেন পরিচালক। হরির সাথে যাত্রা করার আগে কমলিনী টকিজের সমস্ত কাগজপত্র, রিল, ক্যাসেট লন্ডভন্ড করে মাটিতে ফেলে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল প্রণবেন্দু। দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো কমলিনী টকিজ, জ্বলতে লাগলো প্রণবেন্দুর সারাজীবনের জড়ো করা সমস্ত বিশ্বাস, ভালোবাসা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা। জ্বলতে লাগলো সময়ের তালে তলিয়ে না যাওয়া, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে আঁকড়ে থাকা এক সিনেমাওয়ালা...
Paran Bandyopadhyay Koushik Ganguly Parambrata Chattopadhyay Sohini Sarkar

No comments:
Post a Comment